Menu

সর্বশেষ


পরাগ সঞ্চিতা

এক.
সময়ই সবচেয়ে বড় বন্ধু। বয়স বাড়ার সাথে সাথে, জীবনের অনেক উত্থান পতনের টানা পড়েনে, বহুবার হাতে নাতে গুরুজনদের এই উপদেশ বাণীর কার্যকারিতার প্রমান পেয়েছি। অদ্ভুত, আজব এক সময়ে এসে পড়েছি আমরা- হোমোসেপিয়েন্সরা। সমস্ত পৃথিবীর মানুষ যখন এক অযাচিত, অজানা, অচেনা, ভাইরাসের শংকাতে অনিশ্চিত জীবনযাপনের মোকাবিলা করছে, সমগ্র বিশ্বের পাশাপাশি এই আমেরিকাতে যখন আমরা এক অবোধ্য, অজানা সঙ্কটে শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক আশংকাতে হিমশিম খাচ্ছি-, যখন এক চিলতে সুক্ষ কোনো আশার আলোর অন্নেষাতে মন দিশেহারা, অধৈয্য; তখন গুরুজনদের এই উপদেশটি আমাকে ধাতস্থ করে । তাই সময়ের হাতে নিজেকে সমর্পনের সির্ধান্ত নিয়েছি। আমি প্রত্যাশাতে থাকি সময়ই পাড় করবে এই দুঃসময়কে।
আমরা এখন জীবনের এই থমথমে অস্বাভাবিকতার মধ্যেই খুঁজে ফিরছি স্বাভাবিকতাকে। আমি, আমার বন্ধুরা, আমরা সবাই প্রায়-গৃহ বন্দি । এই পরিস্থিতে কেউ কেউ সন্তানদের নিয়ে নতুন নতুন রান্নার চেষ্টা করছেন, কেউ কেউ অনলাইনে জিমের ক্লাসে একটিভ থাকার চেষ্টা করছেন, কেউ কেউ ঘর গেরস্থালীর অসমাপ্ত প্রজেক্টগুলোতে মনোযোগী হয়েছেন। লক্ষ্য একটিই – আমরা যেন হতাশাগ্রস্থ হয়ে না পড়ি। কেউ কেউ পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের নিয়ে চিন্তিত, কেউ কেউ শারীরিক শংকার চেয়ে আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দার দুশ্চিন্তাতে কাতর। কিন্তু যতই আমরা এই অস্বাভাবিকতাকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করিনা কেন অন্তর্দহনের জ্বালাতে ভুগছি কম বেশী সবাই। আমার তেরো বছরের মেয়েটি অসহায় এক করুন মুখে এক ঘর থেকে আর এক ঘরে পায়চারী করে। স্কুল-ম্যাগাজিনের এডিটর, জাতীয় জ্যাজ ব্যান্ডের পিয়ানিস্ট, ডিস্ট্রিক্টের সেরা ডিবেট টিমের সদস্য, গণিতে দুই ক্লাস এগুনো আমার এই মেধাবী সদা ব্যাস্ত কিশোরী মেয়েটি হটাৎ করেই বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। যতই অনলাইনে স্কুলের ক্লাস, অনলাইনে পিয়ানো লেসন, বোনের সাথে কুকি আবার কখনো বা মাফিন বেকিং, কিংবা বাবার সাথে বাইকিং করুক না কেন ভেতরে ভেতরে প্রতিনিয়ত মিস করে ওর স্কুলের বন্ধুদের, হতাশাতে ভোগে — মিডল স্কুলের শেষ কি এভাবেই হবে? নানী-দাদির সাথে কি আর দেখা হবে না? এই সব দুশ্চিন্তা ওর কিশোর মন বিক্ষিপ্ত করে তোলে। মাঝে মাঝে আমি নিজেও বুঝে পাচ্ছিনা কিভাবে ওকে বোঝাবো সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।
এই অবস্থাতে বার বার মনে পরে যাচ্ছে নাইন ইলেভেনের কথা, ২০০১ সালের নিউইয়র্কের ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার কথা—সেই সময় কিভাবে অজানা এক শংকাতে ভীষণ এক সঙ্কটময় সময় পড়ি দিয়েছি। দুটো পরিস্থিতির মধ্যে মিল রয়েছে— যদিও সময়, স্থান, কার্যকারণ ভিন্ন। সেই একই থমথমে ভাব, এরপরে কী, কি করণীয়, সেই একই নিরাপত্তাহীনতা, সেই অনিশ্চয়তা…। আরেকটি বিশ্ব যুদ্ধের আশংকাও করছিলেন কেউ কেউ। নাইন ইলেভেনের পরিনাম স্বরূপ যে হতাশা, মানসিক বিষন্নতা, অনেকের ক্ষেত্রে স্বজন-বন্ধু-সহকর্মী হারানোর হাহাকার আমরা উৎরে উঠেছি বা এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি– সেই পরিস্তিতির সাথে আজেকের হতাশা আর মানসিক অস্থিরতার মিল রয়েছে। নাইন ইলেভেনের গল্প হয়তো আজ সময় উপযোগী নয়, কিন্তু এই গল্প কারো মনে হয়তো সাহস যোগাবে। নাইন ইলেভেনে তিন হাজার নিরপরাধ মানুষের আকস্মিক প্রাণনাশের দূর্ঘটনা শুধু নিউ ইয়র্কার, আমেরিকান, আর সমস্ত বিশ্বকে শোকাভিভূত , স্বম্ভিতই করেনি বরং শিখিয়েছে টিকে থাকার নতুন মাত্রা। আমরা নাইন ইলেভেনের দুঃসময় পাড় করে এসেছি, আমরা পাড়ি দেব এই শঙ্কাময় অনিশ্চিত সময়ও।
আজ আমি এক বন্ধুর গল্প বলবো যিনি সাইত্রিশ জন সহকর্মীকে একই দিনে একই সময়ে হারিয়েছিল নাইন ইলেভেনে। সেই দিশেহারা, হতাশাগ্রস্থ বন্ধুটি অনেক স্বজন-বন্ধু-সহযোদ্ধা হারানো ভুক্তভোগী মানুষদের একজন। সময়ের সাথে সাথে সে কাটিয়ে উঠেছে মানসিক ভারসাম্যহীনতা। সময় আমাদের ভুলিয়ে দেয় যাবতীয় রোগ -শোক-দুর্ভোগ আর কষ্টের কথা।
প্রতিদিন কুইন্সের ফরেস্ট হিলে নিজের বাসা থেকে বাস নিয়ে অফিসে যেতেন আমার বন্ধু ভদ্রলোকটি, বাস স্টপ এক্কেবারেই উনার বাড়ির গেটের বাইরে। প্রায়শঃই বাসা থেকে বেরুতে বেরুতে উনার দু এক মিনিট দেরি হয়ে যেতো। প্রতিদিনের যাতায়াতে মুখ চেনা বাস ড্রাইভার মাঝে মাঝে আমার বন্ধুটির দেরী হলে কিছুক্ষন অপেক্ষা করতো। সেপ্টেম্বর ইলেভেনে আমার বন্ধু ভদ্রলোকটি ঠিক ঠিক সময়মতো ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির বারান্দাতে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, বাসটি এসে গেটের বাইরে দাঁড়ানোর সাথে সাথে উনি বড় বড় লম্বা পা ফেলে বাসের দিকে হাঁটা শুরু করলেন, আশ্চর্য ঘটনা বাসটি তাকে ছেড়েই সহসা চলে গেলো! হতবাক আমার বন্ধুটি মহা বিরক্তি নিয়ে গজর গজর করতে করতে বাধ্য হয়ে ট্রেন স্টেশনের দিকে হাঁটা দিলো। ট্রেন স্টেশন ছয় ব্লক দূরেই শুধু না, লোকাল ট্রেনে যেতেও সময় বেশি লাগে। ট্রেন থামার সাথে সাথে কাজে দেরী হবার দুচিন্তাতে হন্ত দন্ত হয়ে সাবওয়ে স্টেশন থেকে বেরিয়েই ভাবাবচেকা খেয়ে গেলেন– দেখলেন চারিদিকে শুধু কালো ধোঁয়া আর ধোঁয়া, মানুষ জন দিশেহারা হয়ে দৌড়াচ্ছে, মানুষগুলোর মুখে ভীতির ছাপ, ফায়ার সার্ভিসের ট্রাক ননস্টপ বেজে চলেছে,…প্রথম টাওয়ারটি ততক্ষনে ভেঙে পড়েছে। আমার বন্ধুটি দিক বি দিক জ্ঞান হারিয়ে মানুষের ঢলের সাথে মিশে গেলেন, দীর্ঘ পথ পায়ে হেটে, কুইন্স ব্রিজ পেরিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেলো।
কয়েক দিন পরে উনি জানতে পেরেছিলেন ওই দিন উনার অফিসের সাইত্রিশ জন সহকর্মী মারা গেছেন টুইন টাওয়ারে জঙ্গী বিমান হামলাতে, তাদের কারোরই কোনো চিহ্নই আর পাওয়া যায়নি। অনেকের মতো আমার বন্ধুটিও বহুদিন পর্যন্ত মানসিকভাবে বিপর্যর্স্ত ছিলেন, ভুগছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীনতায়, শরণাপন্ন হয়েছিলেন মনোবিদের। এখনো ওই দিনের স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় , এখনো তিনি ভাবে পাননা কেন সেই দিন বাস ড্রাইভার উনার জন্য অপেক্ষা করেনি ! এমন অনেক অজানা রহস্য প্রকৃতি আমাদের জন্য অজানাই রেখে দেয়।
পরিষ্কার মনে আছে মঙ্গলবার সকাল, ন’টার একটু বেশি বাজে, দশটার দিকে বের হবো, সাবওয়ে নিয়ে যাবো কাজে, তিনটেতে কাজ শেষে যাবো স্কুলে, প্রফেসর হ্যান্ডেলের ক্লাস বিকেল পাঁচটাতে, শীতের আমেজ রয়েছে, জ্যাকেট নেবো না নেবোনা বুঝতে পারছিনা। এদেশে বলে তিনটি ডাব্লিউএর কোনো ঠিক ঠিকানা নেই- ওয়েদার, ওমেন, আর ওয়েলথ। কলেজের বইখাতা গুছাতে গুছাতে টিভি ছাড়লাম টেম্পারেচার চেক করার জন্য। টিভি চলছে হটাৎ মহা হুলুসথুলুস— এটাক!!! এটাক!!! টুইন টাওয়ার এটাক!!! দেশে ফোন করলাম, মা’ আর ভাইকে উত্তেজিত কণ্ঠে বললাম “CNN দেখো CNN দেখো-” ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইলাম আমরাও।
মনে পড়ে সেই সময় ফার্স্ট টাওয়ারে আমার ঘন ঘন যাতায়াত। ডাউন টাউনের থার্ড এভেন্যুইতে এক ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁতে – সপ্তাহে তিন দিন কাজ করতাম, দুপুর এগারোটা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত পারল প্যালেসে ওয়েট্রেসের কাজের পরে বিকেলে সিটি কলেজে মাস্টারসের ক্লাস সন্ধ্যা ছয়টা থেকে। কাজ থেকে দুই ব্লক হাঁটলেই টুইন টাওয়ার্স। স্কুলে যাবার পথে আর ছুটি-ছাটাতে সময় পেলেই মাঝে মাঝে চলে যেতাম প্রথম টাওয়ারের নিচ তলাতে বর্ডার নামের একটা বইয়ের দোকানে। টাওয়ারের মাটির তলদেশে বা পাতালে ছিল পাতাল রেল স্টেশন (সাবওয়ে), আর ছিল বিশাল বিশাল সারি সারি সব ডিজাইনারের দোকান, স্টুডেন্ট লাইফ এ পয়সা ছিলোনা কেনাকাটা করার, কিন্তু উইন্ডো শপিংএ তো বাঁধা ছিলোনা, তাই উইন্ডো শপিংএর নেশা মাঝে , মাঝে পেয়ে বসত। টাওয়ারের আটাশি তালাতে আমার সেই বাঙালি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু বা বড় ভাইয়ের অফিস। মাঝে মাঝে উনার সাথে দেখা হলেই ধরে নিয়ে যেতেন এক্কেবারে ছাদের উপর ১০৭ তলাতে “উইন্ডোজ ওন দা ওয়ার্ল্ড” নামের রেস্তোরাতে ম্যানহাটনের স্কাই লাইন দেখাতে । দক্ষিণ দিকের ওয়াইল্ড ব্লু’ ডাইনিং রুমের মেঝে থেকে ছাদ অব্দি দীর্ঘ প্রসারিত কাঁচের জানালা দিয়ে দেখা যেত ম্যানহাটনের দক্ষিণ দিকের হডসন নদীর দৃশ্য, এলিস আইল্যান্ড, লিবার্টি স্টেট পার্ক, ভেরাজানো-ন্যারো ব্রিজ, স্টেটন আইল্যান্ডটি।
নাইন ইলেভেনে বিশ্বকে স্বম্ভিত করে ঘটেছিলো ইতিহাসের আরেকটি লজ্জাজনক নির্মমতা, মনুষত্বের ক্ষরণ। উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী দল এই আমেরিকার মাটিতে চারটি প্লেন হাইজ্যাক করে আত্মঘাতী হামলা চালায়। দুটি প্লেন নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার ভেদ করে ধ্বংস স্তূপে পরিণত করে টাওয়ার দুটোকে। বিধ্বস্ত টাওয়ার দুটোতে ছিল হোটেল, অফিস, দোকান-পাট, সাবওয়ে স্টেশন–প্রায় ৩,০০০ (তিন হাজার) মানুষ আটকে পড়ে প্রাণ হারিয়েছিলো ওই টাওয়ার দুটোতে!
সেই সময় আজ ইতিহাস। নাইন ইলেভেনের আকস্মিক দুর্ঘটনার বিপর্যয়কে আমরা পাড়ি দিয়ে এসেছি। আজ মানব জাতি নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অজানা, অচেনা এক অদৃশ্য শত্রূ-করোনা ভাইরাসের মহামারীতে সমগ্র বিশ্বের মানব জাতি যখন টিকে থাকার লড়াইয়ে দিশেহারা তখন আমি দিব্বি করে বলতে পারি – আজকের এই দুঃসময়ের দিন আগামীতে হয়ে যাবে আমাদের উঠে দাঁড়ানোর ইতিহাস। আমার ডেস্কের উপরে দেয়ালে টাঙ্গানো ভ্যান গোঁর (Van Gogh) উক্তি আমাকে সাহস দেয়. “our greatest glory consists not in never failing, but in rising every time we fall.” কাছা কাছি বাংলা অনুবাদ হতে পারে “ব্যর্থতা-বিহীন জীবন নয়, বরং বার বার ব্যর্থ হবার পরে হতাশ না হয়ে শক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ানোর মধ্যেই আমাদের কৃতিত্ব। ” নাইন ইলেভেনের শোক, কানেক্টিকাটের নিষ্পাপ শিশুদের মেরে ফেলার শোক, প্রতিদিনের আগ্নেয়াস্র-সন্ত্রাসের ঘটনার মতো মানব সৃষ্ট সব অজাচার, নৃশংসতা, বিপর্যয় পাড়ি দিয়ে বার বার লুটিয়ে পড়েও আবার আমরা নতুন আশায় উঠে দাঁড়িয়েছি। আমি বিশ্বাস করি প্রকৃতির এই অপ্রতিরোদ্ধ, অমোঘ ভাইরাসও আমরা প্রতিরোধ করতে পারবো- প্রয়োজন শুধু ধৈর্যের সাথে সময়ের অপেক্ষার।

দুই.
কবে মানুষ হবো?

মিখাইলা আজ ছয় সপ্তাহ পরে চোখ খুলেছে। আমার বন্ধু তুহিন থাকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরে। দুই ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রী মিখাইলাকে নিয়ে পঁচিশ বছরের সুখের সংসার। ছ’ সপ্তাহ আগে সামান্য সর্দি কাশির চিকিৎসা নিতে ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে- নানা পরীক্ষা নিরিক্ষাতে মিখাইলার শরীরে ঘাতক করোনার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। হসপিটালে ভর্তির দ্বিতীয় দিন রাত তিনটার দিকে হসপিটাল থেকে মিখাইলার ফোন এলো, বিচলিত তুহিন আধা ঘুমে তড়িঘড়ি করে ফোন তুললো, ফোনের ওপার থেকে দুর্বল কণ্ঠে মিখাইলা বললো “প্রিয়তম তোমার সাথে আর দেখা হবেনা”– গভীর ঘুম থেকে হটাৎ জেগে উঠা হতভম্ব, আমার বন্ধু, তুহিন কিছু বুঝে উঠার আগেই মিখাইলা বললো “তুমি আমাদের মেয়েটিকে দেখে রেখো। ছেলেটিতো স্বাবলম্বী হয়ে গেছে, ওকে নিয়ে চিন্তা নেই। তবে মনে রেখো আমি তোমাকে কতটা ভালোবেসেছিলাম”। তুহিন কি বলবে, কি ভাববে, অনুভূতিগুলো বোধগম্য হবার আগেই মিখাইলা দুর্বল কণ্ঠে বললো “আমাকে এখন ইনটেনসিভ কেয়ারে নিয়ে যাচ্ছে, আমি জানি এ যাত্রাই আমার শেষ যাত্রা, এই আমাদের শেষ কথা”
সেই থেকে আমার মোবাইলে তুহিনের ঘন ঘন ফোন আসা শুরু করলো। আর ও ফোন করলেই আতংকে থাকতাম- এই বুঝি সেই দুঃসংবাদটি পাবো, মনে মনে কথা সাজাতাম— কি বলে তুহিনকে সাহস দেব? আমার উদ্বেলিত কণ্ঠে “হ্যালো তুহিন, সব ঠিক আছেতো”? শুনেআমার মেয়েরাও আতঙ্কে থাকতে লাগলো। গ্লোবাল ওয়ার্ল্ডে বসবাসের সুযোগে এখানে ওখানে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা ছেলেবেলার বন্ধুরা— আমি, মামুন, ডিউ , আরো অনেকেই গত ছ’-সপ্তাহ ধরে পালা করে প্রতিদিন তুহিনের সাথে ফোনে কথা বলে এই দুঃসময়ে দূর থেকে ওর শংকা আর উদ্বেগ লাঘবের জন্য ওকে সাহস দিয়ে চলেছি। মিখাইলার দৈনন্দিন শারীরিক অবনতি আর উন্নতির কথার পাশাপাশি কত যে অপ্রয়োজনীয় কথা আর গল্পেপ্রতিদিন অনেকটা সময় কেটে যায় তুহিনের সাথে ফোনে! হ্যা অনেকটাসময়ইতো! যা সম্ভব হয়েছে শুধু এই করোনা কালের রুটিন ছাড়া হটাৎ অনভিপ্রেত এই শিথিল সময়ের কারণে। অথচ আগে ছোটা-ছোটা -আর ছুটে চলার তথাকথিত ব্যস্ত জীবনে এতো গল্প আলাপের সময় কার ছিল? কথা বলাতো দূরের কথা—কত সময় প্রিয় বন্ধুদের টেক্সটের উত্তরও দিতে পারিনি! সকালে তড়ি-ঘড়ি করে কাজে ছুটতাম, কতদিন যে কোনো মেকআপ ছাড়াই তাড়া -হুড়ো করে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রাস্তাতে ট্রাফিক লাইটে থামার ফাঁকে ঝটপট কাপ-হোল্ডারে রাখা লিপস্টিক আর প্রেস পাউডারের কৃত্তিম প্রলেপ দিয়ে সকালের জড়তা ঢেকে স্বস্তি পেতাম!
আমার সেই আগের অস্বাভাবিক, বা তথাকথিত স্বাভাবিক, যান্ত্রিক জীবনের অকস্মিক বিলুপ্তি ঘটেছে। করোনা মহামারী সুযোগ করে দিয়েছে এই অখন্ড সময়ের, আর এই সময় সুযোগ করে দিয়েছে প্রিয় মানুষেদের সাথে হটাৎ নৈকট্যের, সুযোগ করে দিয়েছে আত্মীয় – স্বজন আর বন্ধুবান্ধবের সাথে সম্পর্কগুলো নতুন করে ঝালিয়ে নেবার। করোনা-অবকাশে নতুন করে যেন চিনতে, বুঝতে পারছি নিজেকে, সন্তানদেরকে, জীবনসঙ্গীকে। এই কদিন আগেও সারাদিন কাজের শেষে হাপাতে হাপাতে বাড়ি ফিরে রাতের খাবারের জোগাড় যন্ত্র করা ছিল ঝক্কিময়-ভারবহ। আর এখন সেই আমিই মেয়েদের নিয়ে আনন্দে মেতে উঠি নিত্য নতুন নানা রকম রান্নার চেষ্টাতে। আগে যে সময়টা কাটিয়েছি আয়নার সামনে-, সেই সময়ে এখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে হাঁটতে যাই রোদ্দুরে। আমার মেকআপহীন মুখমন্ডল উজ্জ্বল হয় অকৃত্তিম হাসি আর সূর্য রশ্নিতে- আর আমার যত সাজ সজ্জা পরে থাকে বদ্ধ ঘরে অপ্রয়োজনীয়ভাবে। এখন মনে হয় কত মধুর এই পরিবারের বন্ধন, সন্তানদের সাহচর্য, মন কাড়ে ওদের কথা বলার ধরণ, চোখে পড়ে অভিনব চাল-চলন, ওদের ভৱনা চিন্তার সাথে পরিচিত হয়ে অভিভূত হই! এতো বছর ধরে পাশাপাশি এক ছাদের নিচে এক সঙ্গে বসবাসের পরে হটাৎ এই গৃহবন্দি অবকাশে অনুভব করি সঙ্গীর নিৰ্ভেজাল মায়া আর সহমর্মিতা! এই দুঃসময় আমাকে সময় করে দিয়েছে পেছনে ফিরে তাকানোর। যে সুখের সন্ধানে এতো ছুটে চলা, এইতো সেই সুখ, সেই শান্তি- আমার আপন গৃহেই অবহেলায় পড়ে রয়েছে! অথচ আগে বুঝিনি!
গতকাল আমার অহেতুক বিশাল আকৃতির বাথরুমে ঢুকে তাকিয়ে থাকলাম যত অপ্রয়োজনীয় ভ্যানিটির দিকে। কত শখের পারফিউম, প্রিয় লিপস্টিক, দামি ডিজাইনার মেকআপ- সব পরিত্যাক্ত পড়ে আছে! আমার ওয়াক-ইন ক্লোজেটে রকমারি ব্রান্ডের ব্যাগ, শাড়ি -পোশাকের বাহার, শু-রেকের রকমারি জুতার সংগ্রহ, দৈনন্দিন ব্যাবহার্যের অপ্রয়োজনীয় আধিক্ষে নিজেই নিজের প্রতি বিরক্ত হচ্ছি আর অপরাধবোধে ভুগছি। হটাৎ করেই অনুধাবন করছি প্রয়োজন নেই এতো কিছুর। আমার ধর্ম, আমার পরিবার, পিত-মাতা, কোথাও নেই বাহুল্যের শিক্ষা। মনে নেই কবে, কিভাবে এই বাহুল্য আমাকে পেয়ে বসলো? আমার সত্ত্বাতে পরিণত হলো? বিরামহীন ছুটে চলার ব্যাস্ত জীবনে কখন যেন অজান্তেই নিজের স্বত্তা, স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছি, তা বুঝতেই পারিনি। কোরোনার এই আকস্মিক-অদৃশ্য তীক্ষ্ণ থাবা আমার ব্যাস্ত জীবনকে শুধু স্থবিরই করেনি, বরং আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমার এতো সব অর্জন, আয়োজন, অহমিকা— সবই নিরর্থক! বাহুল্য, অপ্রয়োজনীয়। নাথিং ম্যাটার্স, নাথিং…।
কথা হচ্ছিলো আমার ছেলে বেলার বন্ধু তুহিনকে নিয়ে। তো তুহিনের স্ত্রী, অস্ট্রিয়ান মিখাইলা, অনেকদিন কোমাতে থাকার পরে গত সপ্তাহ থেকে একটু একটু করে সাড়া দিতে শুরু করেছে, ফিরে এসেছে ওর চেতনা। ডক্টরদের টীম দেখতে চায় কোমা থেকে ফিরে মিখাইলার মস্তিষ্ক কতটা কাজ করে, তাই তুহিনের ডাক পড়েছে। ডাক্তার বলে দিয়েছে তুহিন যেন বার বার ওর স্ত্রীকে বলে “তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে”! মৃত প্রায় শুষ্ক-শীর্ণ শরীরের দিকে তাকিয়ে কান্না জড়ানো কন্ঠে তুহিন বার বার বলে চলে “তোমাকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে”। কত সুন্দর এই মানব প্রেম! এ যেন তারই উদাহরণ। কে জানে কত না নর-নারী-মানুষ তাদের প্রিয়জনকে এইটুকুও বলার সুযোগ পেলোনা! করোনা যেমন কেড়ে নিয়েছে কত প্রাণ—নিঃশেষ করে দিয়েছে অনেক অসমাপ্ত কাহিনী; তেমনি আবার কত কাহিনীতে সূচনা করেছে নতুন অধ্যায়ের। টেলিভিশন আর সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া কত কাহিনী। কেউ মৃত -প্রায় মাকে ফোনের ক্যামেরাতে শেষ বিদায় জানিয়ে নিজেকে আত্মতৃপ্তির প্রবোধ দিচ্ছে; কেউ স্ত্রীর লাশের জন্য অপেক্ষায় প্রহর গুনছে; কেউ ছোট ছোট সন্তানদের জড়িয়ে ধরে পাশের ঘরে পড়ে থাকা স্বামীর নিস্তেজ লাশের সৎকাজের লোকের অপেক্ষাতে শাকের মাতম ভুলে গেছে। এই সব সত্য ঘটনাবলীর নির্মমতায় যখন আমার বন্ধু রুমা নিজের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার ভারে আতংকিত; তখন আমার বন্ধু মলি নিউইয়র্কে নিজের শরীরে মৃত্যু দূত কোরোনার প্রবল থাবাকে যুঝে চলছে ! কি এক সময় পাড়ি দিচ্ছি আমরা! কি এক সময়?
আমার অতি আদরের স্বত্বা—আমার প্রয়াত বাবা প্রায়শই বলতেন “জগতে পশু-পাখিরা জন্মেই পশু-পাখি হতে পারে; কিন্তু মানব শিশু জন্মেই মানুষ হতে পারেনা। মানুষকে মানুষ হতে হয়”। ছেলেবেলাতে আমাদের পশ্চিম বঙ্গের সংস্কার অনুসারে গুরুজনদের আশীর্বাদ পাবার জন্য তাঁদের চরণ ছোঁবার চল ছিল । গুরুজনরা মাথায় হাত রেখে বলতেন “মানুষ হও”। তখন শিশু মনে প্রশ্ন উদয় হতো আমি কি তাহলে মানুষ নই ? আজ জীবনের মাঝ বেলাতে এসে প্রায়শঃই উপলদ্ধি করি—দালাইলামা যদি মনে করেন হিংসা দ্বেষহীন একজন পরিপূর্ণ মানুষ হতে হলে তাকে আরো কয়েক বার, কয়েক জীবনে জন্মাতে হবে- তাহলে আমার কি হাল? আমি কবে মানুষ হবো?
আমার করোনা-কালীন গৃহ বন্দি জীবনের আজ চল্লিশ দিন গত হলো। করোনার ধাক্কায় চল্লিশ দিনের এই গৃহবদ্ধ জীবনযাপন আমাকে যেন মানুষ হবার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রবাসী জীবনে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলাম, মোহান্বিত হয়ে পড়েছিলাম জগতের বাহ্যিক চাক-চিক্কে; পরবাসে মেতে উঠেছিলাম এখানকার রাজনীতি, অর্থনীতির বিতর্ক বিশ্লেষণে; ডুবে ছিলাম আরো উপরে উঠার রোজকার হিসেবে- ডিজাইনার গাড়ির সংখ্যা, বাড়ির সংখ্যা-আয়তন, দেশ ভ্রমণের তালিকা, আরো কত কিছু! করোনা মহামারী হটাৎ করেই আমাকে থামিয়ে দিয়ে ভাবিয়ে তুলে–এদেশে আসার আগে এতো কিছু কি কখনো ছিলো আমার মননে?—স্বদেশে, এই আমেরিকাতে, সমস্ত বিশ্ব জুড়ে কত শত অভাবী-দুর্ভগী মানুষেরা! সিরিয়া, ইয়েমেন, মায়ানমার, কেনিয়া, আরো কত কত দেশে ঘটে চলেছে মানবতার ক্ষরণের খবর- সবই অতি স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছিলাম। যেন এই সব দুর্ভোগ আর দূরাচার; বিভেদ আর কলহ নিত্যকার মামুলি ব্যাপার! ভাবিনি আমার শিক্ষা, বিবেক, তারুণ্যের মানব সেবার পণ; তাকাইনি একবারও পেছনে ফিরে, নিজেকে সুযোগ দেইনি বদলাবার!
ভুলে গেছিলাম রাজশাহীতে পাশের বাড়ির নমিতাদি’কে— স্বামী হারা এই বিধবা কিভাবে এই দুস্সময়ে দিন পার করছে? ভুলে গেছিলাম আমাদের সেই পুরাতন ভৃত্য দুলালের কথা— আমাদের পরিবারের সবাই দেশ ছাড়ার পরে পুরান ঢাকার হোটেলে রান্না করে যে দুলাল গ্রামে সংসার চালাতো- হোটেল বন্ধ হওয়াতে আয়-রোজগার বন্ধ, কিভাবে চলছে ওর দুটি শিশু পুত্র, স্ত্রী, আর বৃদ্ধা মাকে নিয়ে? অথবা আমার নিকট-আত্মীয় ভাইটি? মুদির দোকানের আয়ে যার নূন আনতে যার পান্তা ফুরোয়? কিভাবে এই দুঃসময়ে চার চারটি সন্তানসহ পরিবারের ভার বইছেন? এই চল্লিশ দিনের থমকে যাওয়া জীবনে একটু একটু করে ফিরে পেতে শুরু করেছি নিজেকে, নিজের স্বত্তাকে। করোনা নামের এই অদৃশ্য ভাইরাসটি যেন হটাৎ করেই আমাকে আবার মানুষের মতো করে ভাবতে শেখালো, বলা যায় হয়তো মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিলো।
ক’দিন আগে আমার বন্ধু ক্রিস ওর ফেসবুকে আমেরিকান বিপ্লবী কবি সোনিয়া রেনী টেলর’ এর একটি সময় উপযোগী অসাধারণ উক্তি পোস্ট করেছিল যার কাছাকাছি বাংলা ভাবানুবাদ -“আমরা আর কখনই সেই আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারবো না। আসলে আমাদের প্রাক-করোনা অস্তিত্বটি কখনই স্বাভাবিক ছিল না—যা ছিল শুধুই আমাদের লোভ, বৈষম্য, অবসন্নতা, বিভ্রান্তি, ক্রোধ, ঘৃণা, বিচ্ছেদ, বিচ্ছিন্নতা, প্রাচুর্যের নেশা, এবং অভাব— এগুলোকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেবার ভুল চেষ্টা। সুতরাং, আমাদের আর সেই ভুলে ভরা তথাকথিত স্বাভাবিকতাতে ফেরার প্রত্যাশা করা উচিত নয়। বরং আমরা নতুন করে সুযোগ পেয়েছি একটি নতুন কাঁথা বুননের, যে কাঁথাটি বোনা হবে মানবতা আর প্রকৃতির কাহিনী -কথায়।

লেখক: কানেকটিকাট প্রবাসী সাহিত্যসেবী। পুরো নাম রওনাক আফরোজ।

বিপি।সিএস