Menu

সর্বশেষ
সর্বশেষ


এম এ আর শায়েল: ধামাইল গান ও নাচ ছিলো সিলেট বিভাগের ৪ জেলার লোক ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ। বিয়ে হলেই পরিবেশন করা হতো এ গান ও নাচ। বিয়ের তারিখ নির্ধারিত হওয়ার সপ্তাহখানেক আগ থেকেই বাড়ির নারীরা উঠানে দলবেঁধে নাচে গানে সরগরম রাখতেন পুরো মহল্লা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সিলেট বিভাগ থেকে লোক ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ ধামাইল গান ও নাচ হারিয়ে যেতে বসেছে। যদিও এখনো কিছু কিছু এলাকায় ধামাইল গান ও নাচ হয়ে থাকে, তবে অতি সামান্য।
একটা সময় সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজারে ধামাইল গানের ব্যাপক প্রচলন ছিলো। কিন্তু আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন, ডিজিটাল সংস্কৃতির প্রচলন এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে চিরায়ত এই সঙ্গীত দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে।
সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতিতে প্রাচীন এই লোক সংস্কৃতিকে ভুলতে বসেছেন সিলেট বিভাগের অনেকে। সময় দ্রুত বদলে যায়, সেই সাথে বদল হয় সমাজ ও সংস্কৃতির। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বদলে গেছে সিলেট বিভাগের অনেক কিছুই। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভৌগলিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গানের পরিবেশও বদলে গেছে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ উদ্ভিদের মতোই বিলুপ্তির পথে রয়েছে দোতরা, একতারা, ঢোল, মন্দিরা, করতাল, বাঁশিসহ গানের আসরে ব্যবহার হওয়া বাদ্যযন্ত্রগুলোও। প্রযুক্তির কল্যাণে গ্রামীণ মানুষের হাতে এসেছে মোবাইল ফোন। অত্যাধুনিক এই মুঠোফোনের সাহায্যে প্রান্তিক মানুষের কাছে অতি সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে রিমিক্সসহ আধুনিক গান।
ডিস্-সংযোগের মাধ্যমে মফস্বল শহরের প্রায় বাসা-বাড়িতে হিন্দি গান আর সিরিয়ালে মগ্ন হয়ে পড়ছেন তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ। অথচ এককালে সিলেট বিভাগের ভাটি অঞ্চলের গ্রামগুলো বাংলা লোকগানের ঐতিহ্যবাহী জনপদ হিসেবে পরিচিতি ছিলো । এক সময় ভাটি অঞ্চলকে বলা হতো ‘সুরের জন্মভুমি’। কিন্তু নামের সেই মাহাত্ম্য এখন আর চোখে পড়ে না?
যুগ যুগ ধরে সিলেট বিভাগে ধামাইল গানের রেওয়াজ প্রচলিত ছিলো। লোকসঙ্গীতের পুরোধাপুরুষ রাধারমণ দত্তকে ধামাইল গান ও নাচের প্রবর্তক বলা হয়। লোকমুখে শুনা যায়, হেমন্তকালের যে-বছর ফসল ভালো জন্মাতো, সে বছর খুব ঘটা করে উৎসব হতো। বাড়িতে বাড়িতে চলতো বিয়ের আয়োজন। সে আয়োজনে নেচে গেয়ে নারীরা মুখরিত করে তোলতেন পুরো গ্রাম। ধামাইল গানের সুরের ঢেউ হাওরের বাতাসে যেনো আচড়ে পড়তো।
সিলেটের গ্রামাঞ্চলে ধামাইল গান ও নৃত্যে এক সার্বজনীন উৎসব আবহ তৈরি করতো। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল শ্রেণির নারীরা মিলে সমবেতভাবে এই গান পরিবেশন করতেন।
বিশেয়ায়িত গ্রামীণ এই নৃত্যগীতি পরিবেশনে কোনো ধরনের বাদ্যযন্ত্রসহ কোনো মঞ্চের প্রয়োজন হতো না। শিল্পীদের ছন্দময় করতালির মাধ্যমে সমবেত টানা সুর, তাল এবং লয়ের সমন্বয়ে এই নাচ পরিবেশিত হতো। ধামাইল নাচের একটি আকর্ষণীয় অংশে ভাটিয়াল এবং উল্টো ভাটিয়াল নৃত্য করা হতো।
হিন্দু সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে আয়োজিত ধামাইল গান শেষ হওয়ার পর উপস্থিত নারী দর্শকরা উলুধ্বনি বা মঙ্গলধ্বনি দিতেন। বৃহত্তর সিলেট-সুনামগঞ্জ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধামাইল গানের প্রচলন ছিলো। এখন আর সেই ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক ধামাইল গান আর তেমন একটা শুনা যায় না। আগে যেখানে ধামাইলে শুধু ঢোল ও কাশা বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো এখন সেখানে অন্যান্য যন্ত্রও ব্যবহৃত হচ্ছে। পাল্টে দেওয়া হচ্ছে গানের সুর ও কথা। এই সব কারণে ধামাইল তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ এই লোক সংস্কৃতিটি।
মূলত ধামাইল গানকে মেয়েলী সঙ্গীত বলা হয়ে থাকে। ধামাইল নাচের অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে শুধু নারীরাই এতে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তবে শখের বশে পুরুষদেরকেও মাঝে মাঝে ধামাইল গান পরিবেশন করতে দেখা যায়। একটা সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়েরা হাততালি এবং নৃত্যের তালে এ ধরনের গান পরিবেশন করতেন। তবে আধুনিককালে বিয়ে ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও পুজো-পার্বণেও ধামাইল গান পরিবেশন করতে দেখা যায়। তবে আগের মতো বাড়ির উঠানে এ ধরণের গান আর হয় না বললেই চলে। ধামাইল গানের জন্য ১০ থেকে ১৫ জন নারী বাড়ির প্রাঙ্গনের উন্মূক্ত স্থানে গোলাকার দাঁড়িয়ে গানের তালে তালে ঘুরে করতালিতে গীত সহযোগে এই নাচ পরিবেশন করতেন। এ নাচে শ্যালিকা, ভাইয়ের বউ (বৌদি), দাদি, নানী সর্ম্পকের মহিলারাই অংশগ্রহণ করতেন। তবে মা-(চাচি), কাকী-মামী, এরকম কেউ এই পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করতে পারতেন না। নাচের দলটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পরস্পর বিভক্ত দু’টি দল একবার কাছে এগিয়ে পর মুহূর্তে দূরে সরে যায়। যখন কাছে এগিয়ে আসে তখন তাকে ভাটিয়াল বলে, আর যখন দূরে সরে যায় তখন তাকে উল্টো ভাটিয়াল বলে। হাততালি আর করতালি যাই বলা হোক না কেন এই গানের মধ্যে করতালির মধ্য দিয়ে প্রাণের সঞ্চার হয়। চরম বা শেষ মুহূর্তে করতালির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। দুই-তিন-চার করে একপর্যায়ে করতালির পরিমাণ চরমে পৌঁছে ধামাইল নাচ ও গান শেষ হয়। বিভিন্ন পূজা-পার্বন-উৎসবে যেহেতু বাঁধাধরা কোনো নিয়ম নেই তাই ধামাইল নাচের সময় সব মহিলাই সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করতেন। আর শিশুদের অন্নপ্রাশনের সময় শিশুর মা-মামি-কাকী-দাদি-বোন-মাসি-পিসি-পাড়া-প্রতিবেশী সবাই অংশগ্রহণ করতেন এবং শিশুকে নিয়ে মেতে ওঠতে আনন্দ-ফুর্তিতে।
তবে আগের সেই দিন আর নেই। সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে যাচ্ছে ঔৎসুক্য শ্রোতা-দর্শকরাও। ধীরে ধীরে যেন হারিয়ে যাচ্ছে গানের সমৃদ্ধ ধারাগুলো। অতীতের সেই সুর কিংবা গান অতি দ্রুতই যেন পালটে যাচ্ছে। যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হলে হয়তো এ সংগীতধারা সচল রাখা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ঠরা।


Leave a Comments

avatar
  Subscribe  
Notify of

সর্বশেষ সংবাদ