Menu

সর্বশেষ
সর্বশেষ


বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আমরা কেন নেই ? এবং কিছু কথা

–মুহাম্মাদ হারুনুর রশীদ

তাত্ত্বিক উত্তর না খুঁজে বাস্তবিক কিছু কারণ খোঁজার চেষ্টা করছি।

১. শিক্ষা নিয়ে জাতীয় কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কিনা আমাদের জানা নেই। যেমন ধরুন আগামী ২০ বছরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে কোথায় দেখতে চাই, বৈশ্বিক বাজারে এবং দেশীয় বাজারে আমাদের সর্বশেষ চাহিদা কী তার কোন জাতীয় কোন সমীক্ষা হয়েছে কি? উদাহরণ স্বরূপ বলি- উৎপাদন খাতে আগামী ১০ বছরে ২ কোটি দক্ষ কারিগর দরকার, শিক্ষক প্রয়োজন ২০ লাখ, প্রশিক্ষিত শ্রমিক প্রয়োজন ২ কোটি, প্রশিক্ষিত কৃষক প্রয়োজন ৫০ লাখ ইত্যাদি ; সমীক্ষা অনুযায়ী জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনাকে প্রাক প্রাথমিক পর্যায় থেকে ঢেলে সাজানো প্রভৃতির অনুপস্থিতি। আমরা স্নাতক পর্যায়ের গবেষণায়ও দেখেছি শিক্ষা নিয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্য নেই, উচ্চ শিক্ষার্থীরাও তাই মনে করে। সবার আগে নিয়্যাত তথা উদ্দেশ্য ঠিক করা চাই। আমরা আমাদের কোথায় দেখতে চাই?

২. পুরো শিক্ষা খাতে জিডিপির ন্যুনতম ৬% বরাদ্দ থাকার প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে তা ২% এর কাছাকাছি। আর গবেষণা খাতে বরাদ্দের কথা নাই বা বললাম। এ পরিস্থিতিতে তেল কম ভাজা মচমচে চাইলেতো হবে না। দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এখনো ওই পর্যায়ে পৌছায়নি এটাও একটা অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নয় সামগ্রিক ভাবে সকলের যে বেতন দেয়া হয় তা বড়জোর উন্নত বিশ্বের তুলনায় উল্লেখ করার মত নয়। আপনার মাসিক বেতন বড়জোর ওদের ৩ বা ৪ দিনের বেতন থেকেও কম। যেহেতু আমরা গরীব তাই সামগ্রিকভাবে আমরা গরীব। এটা একটা দুষ্টচক্রের ন্যায়। যদি দেশের বিজ্ঞানি ও গবেষকবৃন্দের মাসিক ঘরভাড়া, ডাল, আলু, পটলের চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে! তাহলে গবেষণা কীভাবে হবে?

৩. দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে বোদ্ধা মহলে যে প্রশ্নগুলো আছে তাতো অবান্তর নয়। এখানে বৈশ্বিক মান, পেশাদারিত্ব, বহুস্তর ভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া এ বিষয় গুলো উপেক্ষা করতে থাকলে দেশের জিডিপি মাথাপিছু $ ৫০ হাজার হলেও ৫ টি বিশ্ববিদ্যালয়ও শীর্ষে উঠে আসবে না। যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ, শিক্ষণ বিজ্ঞান এ বিষয় গুলো থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে।

৪. ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সকল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাই অনুপস্থিত। আর সাধারণ নাগরিকদের মাঝেতো বহুদূর। জ্ঞান অন্বেষায় ছাত্র-শিক্ষকদের অনীহা বড় কারণ। সবাই ‘শটকার্ট উপায়ে বড়লোক হতে চায়, খাটতে কেউই চায় না’।

৫. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে অন্য অনেক পেশার মত চাকরি মনে করাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা, বর্তমান ও আগামীর ‘চ্যালেঞ্জ’ মোকাবিলায় পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় থাকা। ‘অফিসে আছি, কালকে অফিসে যাব, কয়টা পর্যন্ত অফিসে আছেন? ‘ ইত্যাদি কথোপকথন, শব্দগুচ্ছ আমার শিক্ষক মহোদয়দের কাছ থেকে যখন শুনি, তখন বুঝতে বাকি থাকে না বারোটা বাজার আর দেরি নাই।

৬. বাংলাদেশে গবেষণার পরিবেশ ও মানসিকতার অভাব প্রকট। অনুসরণ ও অনুকরণ প্রিয় জাতি হিসেবে আমাদের খ্যাতি রয়েছে। নতুন কিছু করা, উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগানোতে আমাদের মনোযোগ কম। কোনমতে পার পেয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তা সংক্রামক ব্যাধির ন্যায়ায় কী ছাত্র-শিক্ষক, সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। পরশ্রীকাতরতাও আত্মোন্নতি, গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে মারাত্মক প্রভাব রাখছে। গবেষকবৃন্দের যথাযথ স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদর্শন অনেকটাই উপেক্ষিত। ঐতিহাসিকভাবে এ ভূ-খণ্ডের ক্ষমতা কাঠামোর পরিচালক ও সহযোগীবৃন্দ উদ্ভাবনী শক্তিকে সৎ উপায়ে কাজে লাগিয়ে হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়ার চেয়ে কূটিল ও সহজ উপায়ে শত কোটি টাকার ধান্দায় ব্যস্ত। ফলে সহজ ভাবে কিছু হয়ে উঠার প্রবণতা বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রভাব রাখছে। নীতিনির্ধারকদের মাঝে গবেষণার গুরুত্ব বোঝার ঘাটতিও প্রকট।

৭. যে নির্দেশক গুলো বিবেচনায় নিয়ে এই তালিকা করা হয় সে নির্দেশক গুলো বিবেচনায় নিয়ে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় গুলো স্থাপিত না হওয়াও একটা কারণ। দেশের গবেষকগণ অনেক ভালো কাজ করলেও তা বৈশ্বিক মানদণ্ড, নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুযায়ী প্রকাশিত না হওয়াও বেশ প্রভাব রাখছে।

৮. যে বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে এখানে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি আবর্তিত হয়ে থাকে সে বিষয় গুলো আদৌ আমাদের শীর্ষে পৌঁছাতে অবদান রাখছে কী?

৯. বিশ্ববিদ্যালয় হতে গেলে যে সুযোগ -সুবিধা, পূর্ব-শর্তগুলো ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পূরণ হওয়া প্রয়োজন তা নিশ্চিত না করে তালিকায় আসার চিন্তা আকাশ কুসুম কল্পনার শামিল। এভাবে অসংখ্য বাস্তবিক কারণ আমরা বলতে পারি। তারপরও আমি মোটেও হতাশ নই। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমাজ অনেক অসংগতি নিয়েই এগিয়ে যায়। অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারলে নিশ্চয়ই আমরাও শীর্ষে পৌঁছাতে পারব। সুদিনের প্রত্যাশায় যাত্রাবিরতি। বাংলাদেশের নায়কেরা ভালোথাকুন।

লেখক: মুহাম্মাদ হারুনুর রশীদ
লেকচারার
লোক প্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিপি/আর এল


Leave a Comments

avatar
  Subscribe  
Notify of