Menu

সর্বশেষ
সর্বশেষ


রওশন আলম পাপুল, গাইবান্ধা : কাকডাকা ভোরে নিজেকে ঘুম থেকে উঠতে হয়। মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে প্রস্তুত করে সকালে নাস্তার পর রেখে আসেন স্কুলে। এরপর বাসায় ফিরে গৃহস্থালীর কাজ শেষে সংবাদের জন্য সহকর্মীসহ সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত এবং নানা উৎসের সাথে যোগাযোগের কাজটি সারেন।

এরপর ঢাকা অফিসের সাথে কথা বলে তৈরী করেন কর্মপরিকল্পনা। কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার পর সংবাদ তৈরির জন্য ছুটে যান শহর, শহরতলী থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। ক্যামেরা সহায়ক ছোট ভাই মোকসেদুর রহমান ছবি তোলার কাজে সহযোগিতা করলেও প্রয়োজনে নিজেও ঘাড়ে তুলে নেন ক্যামেরা। সংবাদের কাজ শেষ করেই বাড়ী ফেরার সময় হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। কখনো বিকেল, কখনো সন্ধ্যা, কখনোবা গভীর রাত। সপ্তাহের অন্তত: পাঁচটি দিনের রুটিন তার এ রকমই। মাঠে কাজ করার সময় বড় ভাই বিপ্লব প্রসাদ পরম  পাশে দাঁড়ান। বাড়ি ফিরে সাংসারিক দায়িত্ব, মেয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি করতে হয় এডিটিং আর স্ক্রিপ্ট লেখার কাজও।

পাঠক, এতোক্ষণ যার সম্পর্কে পড়ছিলেন তিনি হলেন সাম্প্রতিক সময়ে গাইবান্ধার ব্যস্ততম ও কর্মতৎপর নারী সাংবাদিক রিকতু প্রসাদ। ২৪ ঘন্টার সংবাদভিত্তিক টিভি ডিবিসি নিউজের এক উজ্জল সংবাদকর্মী। যার কাজ সারাদেশের সংবাদ সংশ্লিষ্টদের নজর কেড়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করা রিকতু প্রসাদ সাংবাদিকতাকে দু:স্থ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবার অঙ্গিকারে গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে নারীদের জন্য রয়েছে তার গভীর মমতা। কোথাও বাল্যবিবাহ বা নারীর ওপর সহিংস আচরণের খবরে তিনি তা প্রতিবিধানে আপোষহীন, সোচ্চার।

মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কিংবা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অসংখ্য প্রতিবাদী কর্মকান্ডে তার ভূমিকা বা সাহসিকতা প্রশংসনীয়। আরও ভাল কিছু করার জন্য সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হওয়া তার। আট বোন এক ভাই এর মধ্যে তিনি অষ্টম। বাবা স্বর্গীয় রাম গনেশ প্রসাদ। পিতৃনিবাস শহরের মোমেনান রোডে। বৈবাহিক সূত্রে এখন গাইবান্ধা শহরের পার্করোডে রিকতু প্রসাদের বসবাস।

রিকতু প্রসাদ সাংবাদিকতা শুরু করেন ২০১৪ সালে। ওই বছর থেকে তিনি সাপ্তাহিক গাইবান্ধা সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ডিবিসি টেলিভিশনে অনেক সংবাদকর্মীর সাথে প্রতিযোগিতা করে গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। তিনি গাইবান্ধা প্রেস ক্লাব (কাচারি বাজার) এর কার্যনির্বাহী সদস্য, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, সাংস্কৃতিক সংগঠন মোহনাসহ বিভিন্ন সংগঠনে যুক্ত রয়েছেন।

রিকতু প্রসাদের স্বামী অমিতাভ দাশ হিমুন দেশ টিভি ও কালের কণ্ঠের গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। একমাত্র মেয়ে মেঘলীনা দ্যুতি ইতোমধ্যে কবিতা আবৃত্তি ও একক অভিনয়ে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। রিকতু প্রসাদের টিভি সাংবাদিকতায় আসার ব্যাপারে মূল উৎসাহদাতা সময় সংবাদের স্টাফ রিপোর্টার হেদায়েতুল ইসলাম বাবু। পরবর্তীতে গাইবান্ধা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শৈশবে চেনা ¯েœহময় সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবু জাফর সাবু, সাংবাদিক গোবিন্দ লাল দাস, কে এম রেজাউল হক এগিয়ে যাবার পথে সাহস যোগান।

স্মৃতিচারণ করে রিকতু প্রসাদ বলেন, মধ্যরাতে কিংবা ভোরে সংবাদের জন্য বিভিন্ন এলাকায় ছুটে যেতে হয়। যেতে হয়েছে দূর্গম চরাঞ্চলেও। ২৪ ঘন্টার টেলিভিশনের প্রয়োজনে আমাকে ছুটতে হয়। কারণ আমি মনে করি বস্তুনিষ্ঠতা সংবাদের গুরুত্ব বাড়ায়। যেটি ধার করে পাওয়া যায় না। উদাহরণ হিসেবে তিনি সুন্দরগঞ্জের এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকান্ডের পরপরই টানটান উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা তুলে আনতে মধ্যরাতে ছুটে যাওয়া কিংবা বেশকিছু নারী নির্যাতনের ঘটনা বা মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় হাসপাতালগুলোতে যাবার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন রিকতু প্রসাদ।

তিনি আরও বলেন, নারীরাও সাংবাদিকতায় চ্যালেঞ্জ নিতে পারে। প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক পরিমন্ডলের সহযোগিতা। তবে সমাজের এক শ্রেণীর বিকৃত মানসিকতার মানুষ নারীদের অগ্রযাত্রাকে কুৎসিৎ প্রচারণার মাধ্যমে ব্যাহত করতে চায়। কিন্তু গাইবান্ধার বেশিরভাগ সাংবাদিক এবং প্রগতীশীল চেতনার মানুষজন সেই বিকৃত মানসিকতার বিরুদ্ধে। যা আমাকে সাহসী এবং এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগায়। প্রায় সকলেই আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেন।

সংবাদ প্রচারের পর ইতিমধ্যে বেশ কিছু সাফল্য তার ঝুলিতে জমা হয়েছে। তৃণমূলের মানুষের সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরে কাজ করছেন মানুষের কল্যাণে। সবচেয়ে বড় কথা মানুষের মঙ্গল হওয়ায় তিনি আনন্দিত। গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি হিসেবে তিনি সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভালো কাজের জন্য ডিবিসি টেলিভিশন থেকে অভিনন্দনপত্র পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন।

রিকতু প্রসাদ বলেন, সাংবাদিকতা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা, এটা সত্যি। যেখানে খুবই কম সংখ্যক নারী জড়িত। স্বামী-সন্তান ও সংসার সামলিয়ে এই পেশায় কাজ করা অনেক কঠিন। তারপরও ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় আরও অনেক শিক্ষিত নারী এগিয়ে আসবেন এই প্রত্যাশা তার।

এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের গাইবান্ধা প্রতিনিধি ইদ্রিসউজ্জামান মোনা বলেন, গাইবান্ধায় নারী সাংবাদিকতার ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। ২৪ ঘন্টার নিউজ চ্যানেলে প্রথম নারী সাংবাদিক হিসেবে খুব ভালো কাজ করছেন রিকতু প্রসাদ। তবে এর আগে গাইবান্ধায় সাংবাদিকতার সাথে অদম্য সাহস নিয়ে যুক্ত হন মমতাজ বেগম রেখা, মাকসুদা খাতুন অনিতা ও লায়লা নাসরিন কলি। তাদের কথাও মনে রাখতে হবে। বর্তমানে ইতিবাচক সাংবাদিকতা করছেন একুশে টিভির জেলা প্রতিনিধি আফরোজা লুনা। আগামী দিনে আমি সাংবাদিকতায় আরও বেশি মাত্রায় নারীদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করি।

প্রবীণ সাংবাদিক-সাহিত্যিক গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর সাবু বলেন, শিশুকাল থেকে রিকতুকে চিনি। তার মানবিক চেতনা ও মূল্যবোধ নি:সন্দেহে অগ্রগণ্য। প্রতিটি ঘটনায় তিনি যেভাবে সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে সংবাদ কাভার করেন তা কারো দৃষ্টি এড়িয়ে যায়না। সাহসী এই নারী সাংবাদিক আগামী দিনে এই পেশায় আরও ভাল করবেন বলে আশা করেন আবু জাফর সাবু।

বিপি/আর এল


Leave a Comments

avatar
  Subscribe  
Notify of

সর্বশেষ সংবাদ