Menu

সর্বশেষ
সর্বশেষ


আব্দুল মালেক নিরব, লক্ষ্মীপুর থেকে : বিদ্যালয়ের গন্ডি পার হননি। তবুও তিনি ছাত্রলীগ নেতা। প্রায় একযুগ নানা কৌশলে ছাত্রলীগের পদবী হাতিয়ে গড়ে তুলেছেন সন্ত্রাসী বাহিনী ও অঢেল সম্পদ। এলাকাবাসী ছাড়াও তার অপর্কম নির্যাতন ও হামলা থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীরা। ডাকাতি ও অস্ত্রের পৃথক মামলায় চার্জ গঠন হলেও বেপরোয়া তিনি ও তার বাহিনী। এমন অভিযোগ রয়েছে, লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কাজী মামুনুর রশিদ বাবলুর বিরুদ্ধে।

কাজী বাবলু চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়নের দেওপাড়া গ্রামের মো. সিরাজের ছেলে ও র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত লক্ষ্মীপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত নাছির বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড। তিনি প্রায় এক যুগ ধরে স্থানীয় ছাত্রলীগের বিভিন্ন কমিটিতে পদধারী ।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ডাকাতির চেষ্টাকালে ডাকাত নাছির ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড কাজী মামুনুর রশিদসহ ১০ ডাকাতকে আটক করে র‌্যাব-৭। ওইসময় তাদের কাছ থেকে ম্যাগজিনসহ পিস্তল, বিপুল পরিমান অস্ত্র, গুলি, ডাকাতির সরঞ্জাম ও একটি মাইক্রোবাস উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে র‌্যাব-৭ এর ডিএডি মো. নেছার উদ্দিন বাদী হয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় কাজী বাবলুকে দ্বিতীয় আসামী করে গ্রেফতারকৃত ১০জনের নামে ডাকাতি ও অস্ত্র আইনে দুইটি মামলা (জিআর ৫৪৩/১২ ও ৫৪৪/১২) দায়ের করেন। এরপর মামলা তদন্ত শেষে পুলিশ কাজী মামুনুর রশিদ বাবলুকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করেন। বর্তমানে মামলা দুটি বিচারাধীন রয়েছে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে বলেন, ওই মামলায় জামিনে এসে টাকার বিনিময়ে ও নানা কৌশলে ছাত্রলীগের পদ বাগিয়ে নিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে বাবলু। তার সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছে জীম্মি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। তার বাহিনীর হয়ে কাজ না করায় স্থানীয় যুবলীগ নেতা রুবেল, রাজু, ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজসহ বেশ কয়েকজনকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে এলাকা ছাড়া করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চন্দ্রগঞ্জ বাজারের ফুটপাতের দুই শতাধিক দোকান, সিএনজি অটোরিক্সা ষ্ট্যান্ড, বাস ষ্ট্যান্ড থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বাবলু ও তার বাহিনী।

এছাড়াও চন্দ্রগঞ্জ বাজারে তার জেনারেটর সংযোগ নিতে বাধ্য করা, হামলার হুমকী দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানীর পানির বোতল ও ঝাড় বন্ধ করে নিজেই পানির ব্যবসা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ, চন্দ্রগঞ্জ বাজারের দোকানঘর ও চন্দ্রগঞ্জ এলাকায় জমিজমা বিক্রি করতে হলে তাকে চাঁদা দেয়া বাধ্যতামূলক বলে জানিয়েছে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। চন্দ্রগঞ্জ ও বেগমগঞ্জ এলাকায় ইয়াবা ব্যবসা করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার প্রধান দুই সহযোগী হলো, কফিল উদ্দিন ডিগ্রী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এম মাসুদ (২৮) ও ছাত্রলীগ কর্মী শাকিল সাহা (২৭)। এ ছাড়াও তার বিশেষ বাহিনীতে সদস্য রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক অনুগত কর্মী।
স্থানীয়রা জানায়, একসময় কাজী বাবলুর পরিবারে নুন আনতে পান্তা পুরাতো। তার বাবা সিরাজ কাজী হাল চাষের পাশাপাশি বাজারের দিন গ্রামের ফুট-পাতে বসে নারিকেল-সুপারি ক্রয়-বিক্রয় করতো। অথচ বর্তমানে ছাত্রলীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে মাদক, ডাকাতিসহ সন্ত্রাসী চাঁদাবাজি দখলবাজী করে বাবলু এখন অঢেল টাকা কড়ির মালিক। নিজ বাড়ীতে গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন। রয়েছে একটি হাসপাতালের মালিকানার শেয়ার। বিভিন্ন ব্যাংকে তার একাউন্টে রয়েছে লাখ লাখ টাকা। এলাকায় চাঁদাবাজিসহ অভিনব কায়দায় মাদক সরবরাহ করছে। তার ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না। বিভিন্ন জায়গায় তিনি ও তার প্রধান উপদেষ্টা ভাই কাজী মোস্তফা কাজল মাষ্টারের নামেও রয়েছে বিপুল সহায় সম্পত্তি। তার ভাই মোস্তফা কাজল পেশায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেও বাবলুর সকল অপর্কমের মুল হোতা তিনিই বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তার বিরুদ্ধে এলাকায় শালিস বাণিজ্য ও চন্দ্রগঞ্জ থানায় দালালীর অভিযোগ রয়েছে। একজন সরকারি চাকুরী জিবী হয়েও তিনি চন্দ্রগঞ্জ থানা কমিউনিটি পুলিশের সভাপতির পদ দখল করে আছেন বছরের পর বছর ধরে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, কাজী মোস্তফা কাজল বলেন, আমার ভাই কাজী বাবলু ছাত্রলীগের রাজনীতি করেন, এটা সবারই জানা আছে। আমার কাছে কেউ আসলে আমি তাদের সাধ্য অনুযায়ী সহযোগীতা করে থাকি। আমি কোন সালিশ বাণিজ্যে জড়িত নই। তিনি কমিউনিটি পুলিশিং এর কোন দায়িত্বে নাই দাবী করে তিনি বলেন, আমি এই দায়িত্বে না থাকেতে চাইলেও বিগত এসপি শাহ মিজান সাফিউর রহমান আমাকে এ পদে রাখেন। তবে তিনি দায়িত্ব পালন করেননা। নিজেকে মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে দাবি করে তিনি বলেন, শিক্ষক পরিচয় ছাড়া তার কোন রাজনৈতিক পরিচয় নাই। তিনি অন্য কোন কাজে জড়িত নাই।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, ২০০৮ সালে জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি এম আলাউদ্দিনের হাত ধরেই কাজী বাবলুর উত্থান। কাজী মামুনুর রশিদ বাবলু হাই স্কুলের গন্ডি পার হয়নি। তবুও তার (আওয়ামী লীগ নেতা) কল্যাণে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদ বাগিয়ে নেয়। এরপর বিভিন্ন কৌশলে চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের পদ বাগিয়ে নেয়।

চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আবু তালেব বলেন, গত রবিবার (২০ জানুয়ারি) রাতে চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক রিয়াজ হোসেন জয়ের উপর হামলা চালায় কাজী বাবলু ও তার লোকজন। হামলার ঘটনায় চন্দ্রগঞ্জ থানায় মামলা করায় রিয়াজের বাড়িঘর ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে তারা। চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে অছাত্র ও বয়স্কদের দায়িত্ব না দেওয়ার জন্য প্রতিবাদ করায় এরআগেও রিয়াজের উপর একাধিকবার হামলা করা হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২২ জানুয়ারি) রাতে ছাত্রলীগ কর্মী নাদিম মাহমুদ অন্তরকে অনুগতদের দিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করে ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজকে ফাঁসানোর ষড়যন্ত্র করে কাজী বাবলু ও তার অনুসারীরা। অন্তরকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তরের বাবা, মা ও ছোট ভাইসহ ৬ স্বজন সহ ৭জন নিহত হয়।

চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল আমিন বলেন, ছাত্রলীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে চন্দ্রগঞ্জে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে কাজী বাবলু। তার আতঙ্কে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের একনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের অনেকে এখনো এলাকা ছাড়া রয়েছেন। তার বাহিনীর হামলার শিকার হয়ে এখনো হাসপাতালের বেডে কাঁতরাচ্ছেন অনেকে। এমতাবস্থায় কাজী মামুনুর রশিদ বাবলুর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নিলে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

সর্বশেষ গত বুধবার (২৩ জানুয়ারি) ছাত্রলীগ নেতা কাজী মামুনুর রশিদ বাবলুকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে বৃহস্পতিবার (২৪ জানুয়ারি) ডাকাতির প্রস্তুতির একটি মামলায় আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

চন্দ্রগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, কাজী মামুনুর রশিদ বাবলুকে ডাকাতি প্রস্তুতি মামলায় গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ডাকাতি ও অস্ত্র মামলার প্রধান আসামী নাছির বাহিনীর প্রধান মো. নাছির বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তার ব্যবহৃত অস্ত্র-শস্ত্র গুলো ও বাহিনীর হাল ধরেন তার সেকেন্ড ইন কমান্ড কাজী মামুনুর রশিদ বাবলু।

বিপি/আর এল


Leave a Comments

avatar
  Subscribe  
Notify of

এই বিভাগের আরও সংবাদ