যুক্তরাষ্ট্রে খালেদার কথিত বৈদেশিক উপদেষ্টার কারাদন্ড



সাবেদ সাথী, নিউ ইয়র্ক : যুক্তরাষ্ট্রের ছয় কংগ্রেস সদস্যের স্বাক্ষর জালকারী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক বৈদেশিক উপদেষ্টা দাবিদার জাহিদ ফারুক সরদার সাদী ওরফে ফারুক সরদারকে ৪ মাসের কারাদন্ড দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। গত মঙ্গলবার ফ্লোরিডার ওরল্যান্ডোর

ইউনাইটেড স্টেটস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট মিডল ডিস্ট্রিক্ট অব ফ্লোরিডার বিজ্ঞ বিচারক গ্রেগরী এ প্রেসনেল এ রায় প্রদান করেন।
গত ১৭ মে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস ভবনের সামনে থেকে সাদীকে গ্রেপ্তার করেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন(এফবিআই)।তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফেরার ছিলেন।গ্রেপ্তারেরপর তাঁকে ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোয় হাই সিকিউরিটি ফেডারেল ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়। একই সঙ্গে তাঁর পাসপোর্টও জব্দ করা হয়।
ইউনাইটেড স্টেটস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট মিডল ডিস্ট্রিক্ট অব ফ্লোরিডার আনা ইনডাইক্টমেন্টে অভিযোগ করা হয়েছে, জাহিদ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত করতে বিভিন্ন ধরনের চক্রান্ত ও চুরির আশ্রয় নিয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক অব আমেরিকা, ফিফথ থার্ড ব্যাংক, ওয়াকোবিয়া ব্যাংক, ওয়াশিংটন মিউচ্যুয়াল ব্যাংক, সান ট্রাস্ট ব্যাংক, ফার্স্ট প্রায়োরিটি ব্যাংক, আরবিসি সেন্টুরা ব্যাংক ইত্যাদি।
ক্রিমিনাল হিস্টোরির ৯টি পয়েন্টের মধ্যে সাদীর বিরুদ্ধে আনীত পয়েন্টের ক্যাটাগরি চার। এ ব্যাপারে সাদীও আদালতের সাথে একমত পোষন করেন। ২০০৯ সালের ৫ মার্চে প্রদত্ত ৪০ মাসের দণ্ডসহ সাদীকে ২ লাখ ৩৪ হাজার ২২৯ ডলার ৭৫ সেন্ট জরিমানা করা হয়েছিল। বিভিন্ন ব্যাংকের সাথে প্রতারণার মাধ্যমে এই অর্থ আত্মসাত করেছেন বলে আদালতে স্বীকার করেন সাদী। সেই অর্থ সরকারী কোষাগারে ফেরত দেয়ার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু গত ৬ বছরের মধ্যে সাড়ে ৩ বছরের মত তিনি জেলে ছিলেন। এরপর প্রবেশন ভঙ্গ করে নিউ ইয়র্কে বিএনপির মিটিং-মিছিলে সময় অতিবাহিত করায় ওয়ার্কপারমিট নবায়নে সক্ষম হননি। তাই কোন কাজও করতে পারেননি বলে আদালতের অবজার্ভেশন রয়েছে। তাই সেই অর্থ সাদী কীভাবে পরিশোধ করবেন সেটি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে সর্বশেষ মন্তব্যে আদালত উল্লেখ করেছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি জাহিদ এফ সরদার সাদী ছয় কংগ্রেস সদস্যের জাল স্বাক্ষরে ভুয়া বিবৃতি তৈরি করে ১৪১টি সংবাদপত্রে পাঠিয়েছিলেন। এর আগে ২০১৪ সালেও তিনি একাধিক ভুয়া খবর সাংবাদিকদের দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে ইসরায়েলি নাগরিক মেন্দি এন সাফাদির বৈঠকসংক্রান্ত মিথ্যে খবরটিও।ছয় কংগ্রেস সদস্যের জাল স্বাক্ষরে ভুয়া বিবৃতি তৈরি করার ফলে কেন্দ্রিয় ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের চাপের মুখে সাদী ও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দাবিদার এবং চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার আরেকজন সাবেক উপদেষ্টা ডা.মজিবুর রহমানকে খালেদা জিয়ার বিদেশ বিষয়ক বিশেষ দূতের পদ থেকে অপসারণ করা হয়।  
একটি সূত্র জানায়, জাহিদ দীর্ঘদিন ধরে নিউ ইয়র্কসহ বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। অনেকের ঘরেই তিনি ছিলেন অতিথি হিসেবে। তবে কাউকেই তাঁর ব্যক্তিগত সমস্যা বা ফেরারি হওয়ার বিষয়টি জানাননি। তাঁর গ্রেপ্তারের পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপিরই বিভিন্ন গ্রুপ ও উপগ্রুপের নেতাকর্মীরা। ওয়াশিংটনে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির এক সিনিয়র নেতা জাহিদ এফ সরদারের অবস্থান জানানোর পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানা গেছে।
জাহিদ অরল্যান্ডোতে থাকার সময় গ্যাস স্টেশনের ব্যবসা করতেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড চেক মেশিনের সুবিধা নেন। ব্যবসার নামে তিনি ৫৪টি প্রতারণামূলক লেনদেন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০০৬ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত এ সুবিধায় জাহিদ ৫৪টি লেনদেন করেছেন, যার সবই ছিল প্রতারণামূলক। দুই বছরে তাঁর মাধ্যমে ৩৫ ডলার থেকে শুরু করে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত প্রতারণামূলক লেনদেন হওয়ার তথ্য-প্রমাণ এফবিআইয়ের হাতে রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে এফবিআই এর আগে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। পরে তিনি প্যারোলে মুক্তি পান। তবে তিনি প্যারোল অফিসারের সঙ্গে সাক্ষাতের বিধান লঙ্ঘন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়। এ কারণেই তাঁকে খুঁজছিল এফবিআই।

১৯৯৬ সালে জাহিদ ফারুক সরদার সাদী ওরফে ফারুক সরদার যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেই থেকে ফ্লোরিডার ওরল্যান্ডোতে বসবাস শুরু করেন।সেখানে মার্সিয়া পবেলকে তিনি বিয়ে করেছেন। তাদের সংসারে সারাহ পবেল ফারুক একটি কন্যা সন্তানও রয়েছে। দাম্পত্য জীবনে আশান্তি দেখা দেওয়ায় ২০০৮ সালে মার্সিয়ার সঙ্গে তার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। এর ফলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের বৈধতা হারিয়ে ফেলেন। সেই থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাদীকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। জাহিদ ফারুক সরদার সাদী ওরফে ফারুক সরদার ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেছেন বলে আদালতের নথীতে উল্লেখ করা হয়।