নিউ ইয়র্কে আইন পরামর্শসভায় সাংবাদিকদের গালাগাল

বিমান টিকেটের মহা কেলেঙ্কারি

সাবেদ সাথী, নিউ ইয়র্ক: যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে দুই সহস্রাধিক প্রবাসী বাংলাদেশির ক্রয়কৃত বিমান টিকেটের মহা কেলেঙ্কারির হোতা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহন সংক্রান্ত এক পরামর্শ সভায় সাংবাদিকদের অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করেছেন ভুক্তভোগিরা। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার

সন্ধ্যায় নিজস্ব ভবনে এ সভার আয়োজন করেন নিউ ইয়র্কস্থ বাংলাদেশ সোসাইটি। বাংলাদেশি একাধিক আইনজীবি ও প্রতারিত শতাধিক বাংলাদেশি উপস্থিত ছিলেন।  
বিমান টিকেট নিয়ে জালিয়াতি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসের মালিক বিশ্ব প্রতারক নাজমুল হুদার নামে মামলা দায়ের করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী ৮ জুলাই শনিবার বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যকরী পরিষদ ও ট্রাষ্টি বোর্ডের যৌথ সভায় এ বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে বাংলা প্রেসকে জানিয়েছেন সোসাইটির সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুর রহিম হাওলাদার।
সোসাইটির সভাপতি কামাল আহমেদের সভাপতিত্বে এবং সাধারন সম্পাদক রুহুল আমীন সিদ্দিকীর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় ভুক্তভোগিদের আইন বিষয়ক পরামর্শ দেন বাংলাদেশি এটর্নি নাজমুল আলম, এটর্নি ও ব্যারিষ্টার মোস্তফা কামাল এবং অ্যাভোকেট মজিবুর রহমান। এ সময় ভুক্তভোগীরা উত্তেজিত হয়ে উঠেন। তারা উল্লেখ করেন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসের মালিক নাজমুল হুদার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিল দেশ ভ্রমণে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের বিমান টিকেটের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। তাই তিনি পাঁচটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান একযোগে বন্ধ করে সপরিবারে গা ঢাকা দিয়েছেন। বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা উল্লেখ করেন বাংলাদেশ সোসাইটির অন্যান্য সভা সমাবেশে প্রচুর সাংবাদিকের ভিড় দেখা যায়। কিন্তু আজকে কেন মাত্র ৪/৫ জন সাংবাদিক এসেছেন। তারা বাংলাদেশ সোসাইটির এবার কোন বিজ্ঞাপন পাননি নাকি প্রতারক নাজমুল হুদার কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে তাকে বাচাঁনোর চেষ্টা করছেন। এক পর্যায়ে তারা ঢালাওভাবে সাংবাদিকদের অশ্লিল ভাষায় (যা পত্রিকায় প্রকাশ করার মত নয়) গালাগাল করতে থাকেন। এমন প্রশ্নে উপস্থিত সাংবাদিকসহ সোসাইটির কর্মকর্তারাও বিব্রতবোধ করেন। উপস্থিত সাংবাদিকরা এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। তারা বলেন, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসের প্রতারণার খবর নিয়ে মিডিয়ার ভূমিকার বিষয়ে ঢালাও অভিযোগ করা সঠিক নয়। ভুক্তভোগীদের সাথে প্রবাসের সকল মিডিয়াও সহমর্মিতা রয়েছে এবং একাদিক সংবাদপত্র ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেলসের প্রতারণার খবর শিরোনামও করেছে। পরে এটর্নি নাজমুল আলম উপস্থিত ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলাদেশ সোসাইটির সমন্বয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসের  মালিক নামজুল হুদার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেন। ভুক্তভোগিরা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিস কর্তৃক প্রতারণার শিকার প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বাংলাদেশ সোসাইটির মহতি উদ্যোগের প্রশংসা করেন। পরিশোধকৃত বিমান টিকেটের অর্থ আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের পাশে থাকার জন্য সোসাইটির সকল কর্মকর্তা ও মিডিয়া কর্মিদের প্রতি অনুরোধ জানান। ভুক্তভোগীরা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসের বিমান টিকেট প্রতারণা সংক্রান্ত প্রমাণপত্র সোসাইটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে হাস্তান্তর করেন।
বাংলাদেশ সোসাইটির সিনিয়র সহ সভাপতি আব্দুর রহিম হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মনিকা রায়, স্কুল ও শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবীব, কার্যকরী পরিষদ সদস্য ফারহানা চৌধুরী ও আবুল কাশেম চৌধুরীসহ নিউ ইয়র্কের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ঈদুল ফিতরের কয়েকমাস আগে থেকেই মূল্য হ্রাসের বিজ্ঞাপন দিয়ে সস্তায় টিকেট বিক্রির ঘোষণা দেয় ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিস। ফলে নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া, ম্যারিল্যান্ড, জর্জিয়া, কানেকটিকাট, ভার্জিনিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি, ম্যাসাচুসেটস ও টেক্সাসের প্রবাসীরা টিকেট কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আর এই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগান ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসের মালিক নাজমুল হুদা।
তিনি নিউ ইয়র্কের বাইরের অঙ্গরাজ্যগুলির যাত্রীদেরকে টিকেটের মূল্য তার ব্যাংক হিসান নম্বরে জমা দিতে বলেন। যাত্রীদের অনুরোধে সংশ্লিষ্ট বিমানে টিকেট বুকিং না দিয়ে তিনি কয়েক মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছেন বলে ইভিযোগ উঠে। বাংলাদেশগামী শতশত যাত্রীর অব্যাহত অভিযোগ ও অর্থ ফেরতের দাবিতে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসের নিউ ইয়র্কের জামাইকা, ব্রঙ্কস, ব্রুকলিন ও জ্যাকসন হাইটস এবং জর্জিয়া আটলান্টার একটি শাখা বন্ধ করে কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা উধাও হন। এখন পর্যন্ত তাদের কাউকেই আর খুঁজে পাচ্ছেন না প্রতারিত যাত্রীরা।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ঈদের মৌসুমে মোটা অংকর অর্থ আত্মসাতের পর আবারো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ট্রাভেল সার্ভিসের মালিক নাজমুল হুদা নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন। এর আগেও একবার তিনি নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছিলেন।
অপর দিকে, অবৈধ বা কাগজপত্র বিহীন প্রবাসী বাংলাদেশিদের বৈধ করার প্রলোভন দিয়ে ইমিগ্রেশনের ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করে প্রবাসীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে নাজমুল হুদাকে গ্রেপ্তার করেছিল এফবিআই। এ মামলায় তিনি আদালতে দোষী সাব্যস্তও হয়েছিলেন। ছাড়া পেয়ে তিনি আবারো একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাজমুল হুদার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলায়। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত নূরুল হুদার আপন ভাই। আর্থিক লোকসান দেখিয়ে বাংলাদেশ বিমানের ঢাকা-নিউ ইয়র্ক রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য বিমানের একমাত্র ট্রাভেল এজেন্ট ওয়ার্ল্ড ওয়াইড সার্ভিসের মালিক এই নাজমুল হুদাই দায়ী বলে সচেতন প্রবাসীরা দাবি করেন।