বাংলাদেশের হৃদয় হতে

ফারুক ওয়াহিদ



বাংলা নামে যে দেশ- নাম তার বাংলাদেশ! ভাষার নামে যে দেশ নাম তার বাংলাদেশ। পাখির দেশ, ফুলের দেশ, গানের দেশ, ধানের দেশ, নদীর দেশ বাংলাদেশ। তাজা লাল রক্ত দিয়ে কেনা এই বাংলাদেশ- ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ও চার লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর

বিনিময়ে এই বাংলাদেশ- তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি মানচিত্র, একটি লাল-সবুজ পতাকা, একটি জাতীয় সংগীত এবং এই জাতীয় সংগীতটি পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। “মা, তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি”- এরকম শ্রুতিমধুর আবেগময় কথা পৃথিবীর আর কোনো জাতীয় সংগীতে পাওয়া যাবে না এবং পৃথিবীতে শুধু একটি জাতীয় সংগীতই রয়েছে যা পরিবেশন করলে বা শোনলে দু’নয়ন অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে- সেই জাতীয় সংগীতটি হলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি”। বাংলা আমার মায়ের ভাষা যা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম ভাষা- আর এই মায়ের ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন পৃথিবীতে একমাত্র বাঙালিরাই- এই বাঙালি হলো ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ ‘দুধ-ভাতে বাঙালি’। এই দুঃখিনী বাংলা মাকে “দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!” এই বাংলা মায়ের বাঙালিরা হলো- “জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়”- আর তাইতো “বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি”- এবং সেটাও প্রমাণ হয়ে গেছে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে অলৌকিক শক্তিধর ‘জয় বাংলা’র কাছে তথা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর কাছে গণহত্যাকারী নারীধর্ষক ‘জিন্দাবাদধারী’ তথা ৯৩ হাজার হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের বাংলার পবিত্র মাটিতে নির্লজ্জ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ-এর মাধ্যমে শোচনীয় পরাজয় হয়েছিল।
গানই কবিতা- কবিতাই গান এবং গান-কবিতা উভয়ই সাহিত্য- আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ শিরোনামে একটি গান/কবিতার উপাখ্যান নিয়ে আলোকপাত করবো- যে দেশপ্রেমমূলক গানটি স্বাধীনতার সূচনালগ্নে ঢাকার পাকিস্তান টেলিভিশনে লাইভ অনুষ্ঠানে একই গান পর পর কয়েকবার গেয়ে পাকিস্তানিদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং এই প্রতিবাদী দেশপ্রেমমূলক গানটিই ছিল হানাদার পাকিস্তানিদের প্রতি সরাসরি প্রথম আঘাত।
১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা-রক্তঝরা-অশ্রুঝরা-রোদনভরা বাঙালির গৌরবের আবেগময় মাস মার্চ- যে মার্চ মাসকে ‘বাংলাদেশ হেরিটেজ মাস’ হিসেবে কানাডার অন্টারিও পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি  দিয়েছে। ১৯৭১-এর উত্তাল অগ্নিঝরা ২৩ মার্চ দিনটি ছিল মঙ্গলবার। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে দিনটি পালিত হয় পাকিস্তান দিবস এর পরিবর্তে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সেদিন ছিল সাধারণ ছুটির দিন এবং ঢাকাসহ সারা দেশের প্রত্যেক বাসভবন, যানবাহন, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিষদ ভবন, সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, বঙ্গবন্ধুর বাসভবন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ সব প্রতিষ্ঠানে কালো পতাকার পাশাপাশি স্বাধীন বাংলাদেশের গাঢ় সবুজের মধ্যে রক্তলাল সূর্য এবং তার মাঝে স্বার্ণালি মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন প্রাণের পতাকা, আবেগের পতাকা, হৃদয়ের পতাকা উড়ানো হয়। রাজধানী ঢাকা পরিণত হয় পতাকার নগরীতে। প্রেসিডেন্ট ভবন, গভর্নর হাউস এবং ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানের পতাকা দেখা যায়নি। ঢাকার ‘দেনিক পাকিস্তান’ পত্রিকায় সবুজ জমিনের মাঝে লাল সূর্যের ওপর সোনালি রংএর বাংলাদেশের মানচিত্র শোভিত স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকার ছবি প্রথম পৃষ্ঠায় রঙিনভাবে ছাপা হয়েছিল। ২৩ মার্চ রাতে ঢাকার টেলিভিশন কেন্দ্রের বাঙালি শিল্পী ও কলাকুশলীরা রাতের অধিবেশন শেষে পাকিস্তানি পতাকা্ উড়ানো দেখাবে না বলে সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। রেকর্ড করা এবং লাইভ দেশপ্রেমমূলক গান প্রচার হতে থাকে। লাইভ গাইছিলেন ফাহমিদা খাতুন। ফাহমিদা খাতুন গাইছিলেন “বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখি।” তারপর “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে” গানটি ঘুরে-ফিরে বার বার গেয়ে ২৩ মার্চের রাত বারোটা পার করে দেন অর্থাৎ ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন মার্চের ২৪ তারিখ এসে যায়- তারপর ‘চাঁনতারা মার্কা বেইমান পতাকা’ দেখানো হয়। সেই সময়ে ফাহমিদা খাতুন-এর গাওয়া “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে” রবীন্দ্র সংগীতটি উজ্জীবিত করেছিল বাংলার সাড়ে সাতকোটি মানুষকে। পাকিস্তানি সৈন্যরা বা কতৃপক্ষ টেলিভিশনের বাঙালি শিল্পী ও কলাকুশলীদের এই বিদ্রোহ বা চালাকি ধরতে পারেনি এবং টেলিভিশনের বাঙালি শিল্পী ও কলাকুশলীরা পাকিস্তানকে চরমভাবে চপেটাঘাত করে পুরোপুরি পাকিস্তানি ছাগল বানিয়ে দেয়। তবে বিষয়টি পরের দিন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হওয়াতে পাকিস্তানি কতৃপক্ষের টনক নড়ে- তবে ততোক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে। পাকিস্তান কতৃপক্ষ চেয়েছিল রবীন্দ্রনাথ রচিত “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে” গানটি তখনই নিষিদ্ধ করতে কিন্তু সাহস পায়নি- কারণ বেতারে অনবরত বাজছিল রবীন্দ্রনাথের আরেকটি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করার জন্য উত্তেজনামূলক গান- “বাধা দিলে  বাধবে লড়াই, মরতে হবে।/ পথ জুড়ে কি করবি বড়াই, সরতে হবে।।/ লুঠ-করা ধন ক’রে জড়ো কে হতে চাস সবার বড়ো-/ এক নিমেষে পথের ধুলায় পড়তে হবে।/ নাড়া দিতে গিয়ে তোমায় নড়তে হবে।।/ নীচে বসে আছিস কে রে, কাঁদিস কেন?/ লজ্জাডোরে আপনাকে রে বাঁধিস কেন?/ ধনী যে তুই দুঃখ ধনে সেই কথাটি রাখিস মনে-/ ধুলার ’পরে স্বর্গ তোমায় গড়তে হবে/ বিনা অস্ত্র, বিনা সহায়, লড়তে হবে।” উত্তপ্ত অগ্নিঝরা মার্চে সেই গান সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে। রণাঙ্গনে যুদ্ধরত অবস্থায়ও আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বাংকারে বসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এই গানগুলো শুনেছি যা আমাদেরকে হানাদার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে আরো উদ্বুদ্ধ করেছিল- বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের স্বদেশ পর্যায়ের এ গানটি-
https://youtu.be/XA4yG8sPklk

“আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/ তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!/ ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!/ তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥/ ডান হাতে তোর খড়ক জ্বলে, বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ,/ দুই নয়নে স্নেহের হাসি, ললাটনেত্র আগুনবরন।/ ওগো মা, তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে!/ তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥/ তোমার মুক্তকেশের পুঞ্জ মেঘে লুকায় অশনি,/ তোমার আঁচল ঝলে আকাশতলে রৌদ্রবসনী!/ ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!/ তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥/ যখন অনাদরে চাই নি মুখে ভেবেছিলেম দুঃখিনী মা/ আছে ভাঙা ঘরে একলা পড়ে, দুখের বুঝি নাইকো সীমা।/ কোথা সে তোর দরিদ্র বেশ, কোথা সে তোর মলিন হাসি-/ আকাশে আজ ছড়িয়ে গেল ওই চরণের দীপ্তিরাশি!/ ওগো মা, তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে!/ তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥/ আজি দুখের রাতে সুখের স্রোতে ভাসাও ধরণী- তোমার অভয় বাজে হৃদয়মাঝে হৃদয়হরণী!/ ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!/ তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥” স্বদেশ: স্বরবিতান ৪৬; রাগ: বিভাস-বাউল; তাল: একতাল; রচনাকাল: বঙ্গাব্দ: ভাদ্র ১৩১২; রচনাকাল: খ্রিস্টাব্দ: ১৯০৫; স্বরলিপিকার: ইন্দিরা দেবী; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র ৪৪ বছর বয়সে এই গানটি রচনা করেছিলেন।
৪৫ বছর আগের সেই ক্ষোভ এখনো পাকিস্তানিদের অন্তরে তুষের আগুনের মতো জ্বলছে- বিশেষ করে “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি” এই গানটির কথা কিছুতেই ভুলতে পারেনি যে গানটি গেয়ে তাদেরকে প্রথম চরমভাবে চপেটাঘাত করে পুরোপুরি পাকিস্তানি ছাগল বানিয়ে ফেলার ঘটনা- তাই তারা পাল্টা চরম প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বার বার অনেক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ২০১৭-তে এসে ১৬ কোটি মুক্তিপাগল বাঙালি জাতিকে আবারো ঘুমের মধ্যে রেখে চরমভাবে প্রতিশোধ নিয়েছে- কিন্তু পাকিস্তানিরা এই প্রতিশোধ নিয়েছে তাদেরই রেখে যাওয়া প্রতিনিধি বা প্রেতাত্মাদের দিয়ে- যারা বাঙালি হলেও মনে প্রাণে পাকিস্তানি এবং এতো পাকিস্তানি যে পাকিস্তানিরাও এতো পাকিস্তানি না- তারা লাল-সবুজের বদলে ‘চাঁনতারা মার্কা বেইমান পতাকা’র অনুসারী। পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা সেই একাত্তরের ২৩ মার্চের প্রতিবাদী দেশপ্রেমমূলক রবীন্দ্রনাথ রচিত কবিতা/গান “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি” বাংলাদেশের স্কুলের পাঠ্য বই থেকে নিষিদ্ধ করে বাতিল করে দিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে সরিয়ে ফেলে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করে চিরদিনের জন্য সলিল সমাধি ঘটিয়েছে। ২০১৭ সালের স্কুলের পাঠ্যপুস্তক পাকিস্তানি পেতাত্মাদের নগ্ন হস্তক্ষেপে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে- সব আলোচনা না করে আমি শুধু একটি বিষয় নিয়েই আলোচনা করছি। দীর্ঘ ৪৫ বছরতো কোনো অভিযোগ উঠেনি এই কবিতা/গানটির- স্বাধীনতার এতো বছর পর এমন কী হলো কবিতা/গানটি যা পাঠ্যপুস্তকে নিষিদ্ধ করতে হবে? স্বাধীনতার পক্ষের দল আওয়ামীলীগ স্বাধীনতা বিরোধী নেতাদের ফুলের মালা দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে অনেকটা প্রতিযোগিতামূলক ভাবে বরণ করতে করতে পরিশ্রান্ত ও ক্লান্ত এবং কুম্ভকর্ণের নিদ্রায় আচ্ছন্ন- কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভাঙতো ছয়মাস পর পর কিন্তু আওয়ামীলীগের নিদ্রা দেখে দেখে কুম্ভকর্ণও লজ্জা পাচ্ছে- আওয়ামীলীগ যেন বলতে চাচ্ছে- “আমার বলার কিছু ছিল না/ চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে।”
গণভবনে “তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে”- গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ শুক্রবার সন্ধ্যায় গানে গানে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। নন্দিত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে গেয়ে ওঠেন, “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/ তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!/ ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!/ তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥”- রবীন্দ্রনাথের এই দেশপ্রেমমূলক গানটি শুনে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেন- প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার স্পষ্ট মনে আছে ৪৫ বছর আগে এই দেশপ্রেমমূলক গানটি স্বাধীনতার সূচনালগ্নে ঢাকার পাকিস্তান টেলিভিশনে রাতের লাইভ অনুষ্ঠানে ফাহমিদা খাতুন পর পর কয়েকবার গেয়ে পাকিস্তানিদের বোকা বানিয়ে ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন এবং এই প্রতিবাদী দেশপ্রেমমূলক গানটিই ছিল হানাদার পাকিস্তানিদের প্রতি সরাসরি প্রথম চপেটাঘাত। কিন্তু সম্প্রতি এই গানটি নিষিদ্ধ হওয়ায় বা পাঠ্যপুস্তক থেকে চিরদিনের জন্য বাদ দেওয়ায় এরপর রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে কোন্ গানটি গেয়ে সংবর্ধনা দিবেন?   
আমাদের মায়ের ভাষা বাংলাভাষা, বাঙালি ও রবীন্দ্রনাথ একই সুতায় গাঁথা অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বিশাল সাহিত্য ভান্ডার- বাংলার মাটি, বাংলার প্রকৃতি, বাংলার সরল মানুষ ও ভাষার সাথে একাকার হয়ে গেছে। পাকিস্তানিদের দৃষ্টিকোণ থেকে রবীন্দ্রনাথের বড় অপরাধ ছিল- তিনি ছিলেন খাঁটি বাঙালি এবং হিন্দু (প্রকৃত পক্ষে তিনি হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম) এবং তিনি বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারে অনেক কিছু দিয়েছেন এবং বাঙালিকে সারা বিশ্বে গর্বের সাথে পরিচয় করে দিয়েছেন। আর এতো সব কারনেই বাঙালি বিদ্বেষী পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী হিংসায় উন্মত্ত হয়ে উঠে এবং রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করে দেয় এক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।
সবচেয়ে অবাক কাণ্ড ও অতন্ত দুঃখজনক ঘটনা স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও এই স্বাধীন বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ পাকিস্তান আমলের মতোই সাম্প্রদায়িক মানসিকতার দ্বারা বারবার আক্রান্ত হচ্ছেন। তাঁর রচিত “বাংলাদেশের হৃদয় হতে” কবিতা/গানটি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কতৃপক্ষের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকা পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা স্কুলের পাঠ্যবইয়ে কবিতা/গানটি নিষিদ্ধ করে বাতিল করে দিয়ে পাকিস্তানি কায়দায় আক্রমণ করে ৪৫ বছর আগের ঘটনার চরম প্রতিশোধ নিয়েছেন। লাল-সবুজ পতাকাকে মেনে নিতে পারছেন না যারা- তারা বাঙালি হয়েও ‘চাঁনতারা মার্কা বেইমান পতাকা’র অনুসারী- সিকান্দার আবু জাফর-এর ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতার ভাষায় বলবো- “তুমি আমার জলস্থলের মাদুর থেকে নামো,/ তুমি বাংলা ছাড়ো।”
নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশিরভাগ কবিতা/গানই রূপক অর্থে ও অর্ন্তদর্শনের উপর রচিত- এর অন্তনির্হিত ভাব বুঝতে হলে অনেক গভীরে যেতে হয়। আমাদের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কতৃপক্ষ কেন কোন্ দৃষ্টিকোন থেকে কবিতা/গানটি নিষিদ্ধ করে পাঠ্য বই থেকে বাদ দিলেন সেটার স্পষ্ট ব্যাখ্যা জাতির কাছে অবশ্যই দিতে হবে- আর যদি ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন তাহলে- “ক্ষমা তোমায় চাইতে হবে/ নামিয়ে মাথা হে বিধাতা।।” মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিবাদ করা রবীন্দ্রনাথ রচিত “বাংলাদেশের হৃদয় হতে” কবিতা/গানটি অনতিবিলম্বে জরুরী ভিত্তিতে পাঠ্যপুস্তকে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।
বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের বাংলা বিভাগ কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে” গান/কবিতাটির অন্তনির্হিত ভাবটি দেশবাসীর কাছে প্রকাশ করার জন্য।
দেশে জরুরী ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধা মহাসমাবেশ ডাকা হোক- যেটা হবে স্মরণকালের বৃহত্তম মুক্তিযোদ্ধা মহাসমাবেশ। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম মোজাম্মেল হক মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে বা যে কোনো সমাবেশে প্রায়ই বলে থাকেন ‘অস্ত্র জমা দিয়েছি ট্রেনিং জমা দেইনি’ ‘মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার’ তখন তিনি আবেগে থরথর করে কাঁপতে থাকেন এবং তাঁর দু’চোখ ছলছল করে উঠে- তাই এই দুই স্লোগানকে থিম স্লোগান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মহাসমাবেশ ডাকা হোক। এবং এই মুক্তিযোদ্ধা মহাসমাবেশে থিম সং হিসেবে ঘোষণা করা হোক “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি” যেটি সম্প্রতি পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা স্কুলের পাঠ্য পুস্তকে নিষিদ্ধ করে চিরদিনের জন্য বাদ দিয়েছেন। এই থিম সং পরিবেশন করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চে বরণ করে নেওয়া হোক। সবশেষে সুকান্ত-র ‘জাগবার দিন আজ’ কবিতার ভাষায় বলবো- “বাঁচাব আমার দেশ, যাবে না তা শত্রুর দখলে।”

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা(২ নং সেক্টর বাঞ্ছারামপুর)